
এই গরমের ছুটিগুলোতে মায়েদের ভোগান্তির কোন শেষ নেই। সব বাচ্চাকাচ্চারা বাড়িতে। যতক্ষন টিভির সামনে বসে নেই ততক্ষণ হয় তাঁরা উঠোনের পেয়ারা গাছে নয়তো আঙ্গিনার দেয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকবে। কেউ পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেললে তখন? এছাড়া হাসি, কান্না, কিংবা গোপনীয় কোন আইনী এখতিয়ারে একে অন্যকে শাস্তি দেয়া তো আছেই… আর এজন্যই গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হলেই রাজিয়ার মাথাব্যাথাটাও যেন বাড়তে থাকে। কপালের স্নায়ুগুলো কেঁপেই চলছিল, মাথাটা যেন গরমে ফেটে পড়ার উপক্রম, আর গলার পেছনের শিরাগুলো বুঝি এই ছিঁড়ে আসল। একের পর এক বাচ্চাকাচ্চাগুলো তাদের বিচার নিয়ে হাজির, কেউ কাঁদে, কেউ কেউ চিৎকার করে… আর সেই সাথে ওদের খেলাগুলো তো আছেই… আব্বাব্বাআআ… তলোয়ার-মেশিনগান নিয়ে যুদ্ধ, বোমা হামলা…!
ঢের হয়েছে, মাথার চারপাশে কাপড়ের টুকরো শক্ত করে জড়িয়ে ডিভানের উপর শুতে শুতে ভাবছিলেন তিনি। তার এই হট্টগোল আর সহ্য হচ্ছিল না। টিভিটা চালু, যদিও ভলিউম কমানো। বাচ্চাদের কড়া করে শাসিয়ে এসেছিলেন তিনি, আর যখনই পায়ের উপর পা তুলে ভাবছিলেন এই বুঝি একটু স্বস্তি মেলল, তখনই কাঁদতে কাঁদতে হাজির, “দোদাম্মা… দোদাম্মা, ও আমাকে চিমটি দিচ্ছে !” রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আর মনে মনে গাল দিতে দিতে রাজিয়া উঠে দাঁড়ালেন।
এখনই ছয়-ছয়টা বাদর এখানে হাজির–তার স্বামী, লতিফ সাহেব, রুমে ঢোকার সময় মনে মনে ভাবছিলেন রাজিয়া। একেকজন দেবরের দুজন করে, কারও তিন-তিন জন… সবাই ছুটিতে এসে হাজির। আর আমার দুই ছোট বোনের বাচ্চারাও তো আছে— খোদা জানে এখন আমি কী করব! স্ত্রীর এই অবস্থা দেখে লতিফ সাহেব একটু নড়েচড়ে বসলেন। রাজিয়া সবসময়ই বাচ্চাকাচ্চাদের ব্যাপারে একটু এলার্জিক। একেতো এই মাথাব্যাথা, তারউপর বাচ্চাদের এই চেঁচামেচি যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে… অসহায় চোখের কোনে মনে মনে গুনতে লাগলেন তিনি… এক, দুই, তিন, চার… সব মিলিয়ে আঠারোটা— সবগুলো তিন বছর থেকে শুরু করে বারোর ভেতর।
রাজিয়া কিছু বলে উঠবার আগেই বাচ্চাদের লতিফ সাহেবের এক ধমক: “এই, সবকয়টা চুপচাপ বস— যে ই আওয়াজ করবে, সে কিচ্ছু পাবে না!” বাগানের এক ঝুড়ি আম হাতে নিয়ে হুসাইন হাজির। বাচ্চারা যেই আবারো চিৎকার করে আমের ঝুড়িতে ঝাপিয়ে পড়ল, লতিফ সাহেব একটু ভয় ই পেলেন। বউয়ের দিকে অসহায় একটা চাহনি দিয়ে ভদ্রলোক বাথরুমের দিকে সটকে পরলেন। হাতের কাছে এক-দুটোকে টপাটপ ঘা বসিয়ে দিলেন… পুরো গ্রীষ্ম এই অন্তহীন যন্ত্রণা থেকে রক্ষে পেতে হলে কারো কারো জন্য বেডরেস্ট এর বন্দোবস্ত করতেই হবে, মনে মনে ভাবলেন তিনি। খতনা করিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই, মনে মনে ঠিক করলেন তিনি।
তাঁর হিসাব অনুযায়ী, আঠারো জনে আটজন মেয়ে, ওরা বেঁচে গেল। বাকি দশজনের চারজনের বয়স তো আবার জোড় সংখ্যায় – চার, ছয়, আট – এই ছোট বদমাইশগুলাও বেঁচে গেল। কোন উচ্চবাচ্য ছাড়াই বাকি ছয়জনের খতনার ব্যাপারটা লতিফ সাহেব মেনে নিলেন।
তাঁদের পরিবার জেলা শহরের সবচাইতে ধনী পরিবারগুলোর একটা। যদিও লতিফ আহমেদের চার ভাই সরকারি চাকুরে হওয়ায় দূরে থাকতেন, তবু পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলো বড়ভাইয়ের বাড়িতেই হতো। রাজিয়া আপ্যায়নে বেশ হাতখোলাই ছিলেন—অথিতিদের ভালোমন্দ তো তাঁরই দায়িত্ব। তাছাড়া, যে ছ’জনের খতনা, তার মধ্যে দুজন তার ছোট বোনের ছেলে হওয়ায় তাঁর আনন্দই হচ্ছিল।
তাঁর তদারকিতেই সব যোগাড়-যন্ত্র শুরু হল। কয়েক মিটার লাল আলওয়ান কেনা হল। বাচ্চারাও আয়োজনে তাদের দোদাম্মার সাথে জুড়ে গেল। রাজিয়া লুঙ্গির মাপে কাপড় কেটে নিচ্ছিলেন। বাড়ির মেয়েদের তো অনেক কাজ বাকি—লুঙ্গি রঙ করা, সিকুইন আর জরি সেলাই করা। ছেলে ছ’জনের লুঙ্গির পরেও বেশ খানিকটা কাপড় বেঁচে গেছে। এ দেখে রাজিয়া ভাবতে লাগলেন বাকিটা দিয়ে কী করা যায়। হঠাৎ মনে হল, “আরে, বাবুর্চি আমিনার বেটা আরিফ হলে কেমন হয়? আর তারপর আমাদের খামারের মুজুরের ছেলে ফরিদও তো আছে … আমরা আরো কয়েকটা এমন গরীব পরিবারের বাচ্চাদের খতনা করিয়ে দিলেই তো পারি।” এই ভাবনা মাথায় আসতেই তিনি সাথেসাথে কাজে নেমে পড়লেন।
শহরে পাঁচ পাঁচটা মসজিদ— এর মধ্যে একটা জামিয়া মসজিদ ও আরেকটা মসজিদ-এ-নূর। পাঁচটা মসজিদের খতিবই শুক্রবার নামাজের পর ঘোষণা দিলেন: “খোদার রাজী-খুশীর জন্য আগামী শুক্রবার বাদ আছর লতিফ আহমেদ সাহেব গণ সুন্নত-এ-ইব্রাহিমের আয়োজন করেছেন। যারা নিজেদের বাচ্চাদের এতে অংশগ্রহণ করাতে চান, অবশ্যই আগাম নাম লেখাবেন।”
তারা সরাসরি খতনা বললেই হতো, কিন্তু মাইক্রোফোন নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করার বেলায় শব্দটা একটু কেতাবী না হলেই নয়। শুনলে মনে হবে ইব্রাহীম নবীর নামে উৎসব। প্রকৃতপক্ষে অর্থ যদিও একটাই—একটা অনুষ্ঠান, যেখানে বাচ্চারা আসতে চাইবে খুশিখুশি, তবে ফিরবে চিৎকার করতে করতে।
সবকিছু পরিকল্পনা মতোই আগাল। বেশ কয়েকটি গরীব পরিবার তাদের ছেলেদের নাম লেখাল। রাজিয়াও একের পর এক লুঙ্গি বানালেন। বাড়ির বাচ্চাদের লুঙ্গিতে সিকুইন আর জরি থাকল বেশি, অন্যরা পাবে সাদামাটাগুলো । তাঁর ছেলে সামাদের লুঙ্গিতে এতটাই সিকুইন লাগানো ছিল যে কাপড়ের রং খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
গাদা গাদা গম আর নারিকেল শাঁস জড়ো করা হল, সাথে কাঠবাদাম, কিসমিস, খেজুর, আর গরুর দুধের ঘী। অদ্ভুত ব্যাপার যে বাচ্চারা একটু আনচান আর ছটফট করছিল ঠিকই, কিন্তু বাতাসে ছিল উৎসবের আমেজ—আর বাকি সবাই ও বেশ খুশি। দেখতে দেখতেই শুক্রবার এসে গেল। আছরের নামাজ শেষ হওয়ার পর লতিফ আহমেদ দ্রুত দুপুরের খাবার খেয়ে মসজিদের পাশে থাকা কম্পাউন্ডে চলে গেলেন। মানুষের জমায়েত হয়েছিল বেশ; খতনা করাতে আসা বাচ্চারা ও তাদের মা-বাবারা লাইন করে দাঁড়িয়ে গেল। যুবকদের এক বিশাল ফৌজ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে উপস্থিত— গায়ে সবার সাদা শালওয়ার আর জুব্বা, আর মাথায় সাদা টুপি বাঁ সাদা কাপড় পেঁচিয়ে নেয়া। শুক্রবারের নামাজের ঠিক আগেই গোসল করে আসায় সবাইকে দেখতে বেশ নির্মল আর তরতাজা লাগছিল। কেউ কেউ চোখে সুরমা দিয়ে এসেছিল, আর গায়ে লেগে ছিল অযাচিত পরিমান আতর। বাতাসেও একটা মনোরম সুবাস ভেসে আসছিল।
খতনা করা হবে নিকটস্থ মাদ্রাসার ভেতরেই। কুস্তিগীর গড়নের ইব্রাহিম দিনটির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সাদা মূল জুব্বার তলায় তাঁর মাংশপেশির নড়াচড়া দেখা যাচ্ছিল। খতনা করা তাদের পরিবারের পেশা হলেও তিনি বাকি সময়ে নাপিতের কাজ করতেন। বিশাল হলঘরের এক কোণে তিনি নিজের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। অনুষ্ঠানের জন্য ধার করা কাঁসার পিঁড়িটা উলটো করে তিনি তাঁর কাজ শুরু করলেন। রাজিয়া আমিনাকে দিয়ে তেঁতুলের রস দিয়ে দুই-দুই বার করে সেটাকে ঘষে-ঘষে ধুইয়েছিলেন, যেন সেটা ঝকঝকে হয়ে ওঠে। উল্টে রাখা পিঁড়িটার সামনে সূক্ষ্মভাবে ছাঁকা ছাই দিয়ে ভরা একটা প্লেট পড়ে ছিল।
ইব্রাহিম সন্তুষ্ট হয়া পর্যন্ত সবকিছু খুঁটিয়ে দেখলেন। এই ব্যাপারে তার অনেক অভিজ্ঞতা। লোকমুখে শোনা যায়, তিনি যখন ছুরি নামাতেন, খতনা এতটাই নিখুঁত হতো যে কোন সংক্রমণ ছাড়াই ঘা শুকিয়ে যেত—এতটাই তার সুখ্যাতি।
হলঘরের আরেক কোনে একদল যুবক বিশাল এক শতরঞ্জি পেড়ে সযত্নে তার ভাঁজগুলো মসৃণ করতে লেগে গিয়েছিল। ইব্রাহিম সবকিছু আরেকবার পরীক্ষা করে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি পকেট থেকে একটা ক্ষুর বের করে তা বাম হাতে ঝট করে ঘষে নিলেন, আর হুকুম দিলেন, “এক এক কইরা লইয়া আহো।”
মুখ বেজার করে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বেচ্ছাসেবী আব্বাস না পেরে বলেই উঠল, “আপনি আমাকে ক্ষুরটা দিলে গরম পানি দিয়ে সেটিকে জীবানুমুক্ত করে আনতে পারতাম। আমার মনে হয়, চাইলে অল্প একটু ডেটলও দেয়া যায়।” ইব্রাহীম আব্বাসের দিকে কটাক্ষে তাকালেন—উনি বুঝলেন এ ছোঁড়া কলেজ ডিঙ্গিয়েছে। যেন কোন নোংরা কীটের দিকে ছুড়ে দেয়া তাচ্ছিল্যে মুখ বাঁকিয়ে তিনি আব্বাসকে কারণ জিজ্ঞেস করলেন। “যাতে ঘা না পাঁকে…” আব্বাস বিচলিত হয়ে কথার খেই হারাল। কিন্তু ইব্রাহীমও ছেড়ে দেবার পাত্র নন। শয়তানি করে জিজ্ঞেস করলেন আব্বাসের এমন কোন ইনফেকশন আছে কিনা। শুনে আব্বাসের বন্ধুদের সে কি হাসি… কী কী কী… রাগে আব্বাস তাদের উপর ফেটে পরল—“সবগুলা অসভ্য”— এই বলে সে হাঁটা ধরল। বিজয়ীর হাঁসি হেঁসে ইব্রাহীম আবার হেঁকে উঠল, “ভেতরে আহো, এক এক কইরা।”
বাইরে থাকা স্বেচ্ছাসেবকরা ছেলেদের তাদের অন্তর্বাস খুলে ফেলতে বলল। লাইনের সামনে ছিল আরিফ—তেরোতে পা দিলেও গায়ে-গতরে সে বেশ বড়। সাধারণত ছেলেরা নয় বছর হওয়ার আগেই খতনা করানো হতো, কিন্তু আরিফের মা আমিনার সে পয়সা ছিল না। আরিফ শালওয়ার খুলে শার্ট টেনে ধরতেই উপস্থিত দর্শকরা টিটকারি দিতে শুরু করল। কোনভাবে হাসি আটকাতে আটকাতে এক যুবক আলতো করে তার পিঠ চাপড়ে তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিল।
পাঁচ-ছয় জন মিলে তাঁকে কাঁসার পিঁড়িটিতে বসাল। পুরোপুরি বিহ্বল আরিফ কিছু বুঝে উঠবার আগেই একজোড়া শক্ত হাত উড়ে এসে তার বগলের নিচে পৌঁছে গেল। হাতগুলো তার উরু চেপে ধরে তার পা দুটো ছড়িয়ে দিল। আসছে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতেই আরো দুজন তার হাত পেছনে চেপে ধরে। আরিফের পাগলা ঘোড়ার মত তড়পাচ্ছিল— ও পালাতে চাচ্ছিল। কিন্তু ওকে চেপে ধরে রাখার লোকজন ওর থেকেও বেশি সেয়ানা আর শক্তিশালী। এমনকি তাকে নড়াচড়া করবার জায়গাও তাঁরা দিচ্ছিল না। আরিফ গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো: “আমারে ছাড়, আমারে যাইতে দে… আইয়ো… আম্মা… আল্লাহ!” এমনটাই হওয়ার কথা ভেবেই কিনা তিন চারজন লোক মিলে সমস্বরে বলে উঠলো: “আরে এমনে চিল্লাচিল্লি করন লাগে না, কও ‘দ্বীন, দ্বীন।’ হাঁপাতে হাঁপাতে আরিফ বলতে লাগল , “দ্বীন… দ্বীন… আল্লাহ… আল্লাহ… আম্মা… অইউউ…”
যখন এই নাটক চলছে, তখন ইব্রাহিম ঠান্ডা মাথায় আরিফের পুরুষাঙ্গে কাগজের মত পাতলা করে কাটা বাঁশের একটি ফালি বেঁধে দিলেন—এমন একটি জায়গা বেছে নিলেন যেখান থেকে শুধু লিঙ্গের সামনের চামড়াটা ঝুলে আছে। তাদের মধ্যে একজন আরিফের মুখ ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন, “বল রে, বল, বাপ আমার, বল দ্বীন, তাড়াতাড়ি বল, তাড়াতাড়ি!” ‘বিশ্বাস’ থেকে শুরু করে ‘ধর্ম’— দ্বীন শব্দটার অর্থ এর মধ্যে যাই হোক না কেন আরিফ তার কিছু না বুঝেও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল, “দ্বীন! দ্বীন!” ততক্ষণে তার জিহ্বা শুকিয়ে সাড়া, ঘামে পিঠ ভিজে একাকার, কেমন যেন এক উত্তপ্ত ঢেউ উঠে এল সারা গায়ে, আর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসল ভয়ে। তাও শেষবারের মতন সে আরও একবার মরিয়া হয়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল।
“কেন, বাপ?” তার পা ধরে আটকাতে থাকা একজন স্বেচ্ছাসেবী জিজ্ঞেস করল। “আমারে ছাড়, আমারে ছাড়, আমার পেশাব লাগসে”—এই কাকুতি মিনতির উত্তরে জবাব আসল “আর এক মিনিট।” তাঁরা তাকে আরো শক্ত করে চেপে ধরল। ইব্রাহিম তার পিঠের পেছনে লুকিয়ে রাখা ক্ষুরটি বের করে এনে এক ঝটকায় আরিফের পুরুষাঙ্গের আগায় চালিয়ে দিল। চামড়াটা গিয়ে পড়ল ছাই ভর্তি খালার উপর। ক্ষত থেকে ছিটকে আসলো রক্ত। ইব্রাহিম অল্প একটু ছাই নিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিল সেটা আপাতত রক্ত পড়া বন্ধ করল। আরিফের মুখ তখন ফ্যাকাশে, সারা গা ঘামে ভিজে একাকার। তখনো তার চিৎকার করে কান্না চলছেই। দুজন যুবক বেশ নিষ্ঠুরভাবেই তাকে তুলে হল ঘরের এক কোনায় মেঝেতে শুইয়ে রাখল। ঠান্ডা প্লাস্টারে পশ্চাৎদেশে কিছুটা আরাম মিললেও অসহ্য ব্যাথাটা তখনো পোড়াচ্ছিল…।
কয়েকজন তরুণ মিলে আরেকটা ছেলেকে ধরে ইব্রাহিমের কাছে টেনে নিয়ে গেল। আব্বাস আরিফকে অল্প পানি খেতে দিল এবং পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগল। আরেকটা কন্ঠ কাঁতরে উঠল, “দ্বীন… দ্বীন…” ছেলেটাকে তার পাশেই একটা মাদুরে শোয়াতেই আরিফের পেটের ভেতরটা যেন যন্ত্রণায় কুঁচকিয়ে মোচড়াতে শুরু করল।
“দ্বীন… দ্বীন…” বিভিন্ন কণ্ঠে সেই চিৎকার চলছেই। চারপাশে শুধু আছড়ে ফেলে রাখা মর্মবেদনাময় একেকটা দেহ। এই তীব্র ব্যথা নিয়েও আরিফের চোখ ঝাপসা হতে থাকলো। ঘুমের জেরে সে প্রায় অচেতন—কিন্তু হুট করেই আবার জেগে উঠল। কয়েকবার ঘুমের গাড়িতে ঢুলতে ঢুলতে সে যখনই প্রায় গভীর ঘুমে ঢুলে পড়ছিল, তখনই কেউ তাকে আস্তে আস্তে ঝাঁকিয়ে তুলল। ব্যাথাটা তখনও ছিল, তবে আগের মত আর অসহ্যকর নয়। সে আস্তে আস্তে চোখ খুলল। আব্বাস তার সামনে দাঁড়িয়ে মায়াভরে জিজ্ঞেস করল, “আরিফ, হাঁটতে পারবি? ওই দেখ, তোর মা আসছে।”
জীর্নশীর্ন বোরকায় ঢাকা আরিফের মা না পারছিলেন বেটামানুষের চোখের সামনে আসতে, না পারছিলেন ছেলেকে এই অবস্থায় একা ফেলে যেতে। দরজার ওপাশ থেকে তিনি উঁকি মেরে যাচ্ছিলেন। ফিকে হয়ে আসা মায়ের বোরকা দেখে আরিফের মনে বয়ে গেল শক্তির জোয়ার। আব্বাসকে ধরে সে উঠে দাঁড়াল এবং ধীরে ধীরে সামলে বেরিয়ে আসল।
দরজার বাইরে টুলে বসে থাকা লতিফ আহমেদ তার হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন। ব্যাগ খুলে আরিফ আবিষ্কার করল এর ভেতর সামান্য গম, আদ্ধেক করে কোড়ানো দুইভাগ নারিকেল শুকনো শাঁস, এক প্যাকেট চিনি, প্লাস্টিকে মোড়া মাখনের টুকরা… ততক্ষণে তার জীভে জল চলে এসেছে।
ভেতরে প্রবেশ করতে যাওয়া ছেলেদের একজন খিড়কীতে থমকে দাঁড়াল। ছেলেটা কান্না শুরু করতেই আরিফ নিজেকে সটান সুপারহিরোদের মত দাঁড় করিয়ে তাকে ডাকল, “এই… ভয় পাইস না সুবহান… ‘দ্বীন’— খালি কইতে থাকবি ‘দ্বীন’… কিচ্ছু হইব না।” ততক্ষণে তার চেয়ে অভিজ্ঞ আর কে আছে!
আমিনা আরিফের কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে তাকে বারান্দায় বসতে বলল। ক্ষতটা যেন লুঙ্গির সঙ্গে লেগে না যায়, সেজন্য সে সাবধানে পা দুটো ছড়িয়ে বসল। লাইনে দাঁড়ানো আরেক ছেলে সজোরে জিজ্ঞেস করল, “কি লো, আরিফ… ব্যথা লাগে?” খুব সাবধানে যন্ত্রণার সব চিহ্ন লুকিয়ে আরিফ বলল, “আরে না রে কানু, একদমই না। একটুও ব্যথা লাগে না।”
কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা দাড়িওয়ালা এক বুড়ো লোক শুনে বলল, “শাবাশ, বেটা” এবং পঞ্চাশ টাকার নোটটা দিতে দিতে বললেন, “এই নে, এটা রাখ, আর নিজের খেয়াল রাখিস।” অপেক্ষারত ছেলেরা সবাই ইর্ষায় আরিফকে দেখছিল। ভিতর থেকে তখনও চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। “দ্বীন… দ্বীন… আইয়ো … আল্লাহ …” আরেকটা ছেলেকে ঠেলে ভেতরে পুরে দেওয়া হল।
একে একে ছেলেগুলো ভেতরে ঢোকে, আর কিচ্ছুক্ষণ পর পর লাল লুঙ্গি পরে বের হয়। এইসব কলরবের মাঝেই সেই মহিলাটার আবির্ভাব। কঙ্কালসার, কালশীটে পরা গাঢ় চোখ— দেখলে মনে হয় কোমড়টাই যেন অদৃশ্য, অথচ বুকের একপাশে তখনো একটা বাচ্চাকে ধরে আছেন। ছেঁড়া শাড়ির ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছিল লুকিয়ে থাকা ফাটা ব্লাউজটুকু। ভদ্রমহিলা তার পেছনে ছয় কি সাত বছরের একটা বাচ্চাকে টেনে-হিঁচড়ে আনছিলেন। বাচ্চাটা চিৎকার করছিল ঠিকই, তবে তিনিও হাতের মুঠি ধরে রেখেছিলেন শক্ত করে। ছেলেটার কান্নাটা হৃদয়-বিদারক। মহিলাটা ছেঁড়া শাড়ির শেষপ্রান্তটা ধরে মাথাটা ঢাকবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাতে শাড়িটা আরও ছিঁড়ে গেল। নিজের কানেই পৌঁছায় না এমন এক শীর্ণ কন্ঠে তিনি ডাকলেন, “ভাইয়া…” কথা বলতে ব্যস্ত লতিফ সাহেব একটু সময় নিয়ে ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে, মা?”
বাচ্চাটা আরো জোরে কেঁদে উঠলো। “আমি অরেও সুন্নত করাইতে চাই, ভাইয়া,” অনুনয় করে বললেন তিনি। “না, না, আমার লাগবো না!” দৌড়াবার চেষ্টা করতে করতে ছেলেটি চেঁচিয়ে উঠল। তাঁর মুঠি তখনও শক্ত করে ধরা। ঠেলাঠেলির মাঝে তাঁর ঘোমটাটা মাথা থেকে সরে গেল। আর কোঁচকানো পেট, বেরিয়ে আসা কলারবোন, নিভু নিভু নয়ন, আর ছেঁড়া ব্লাউজটা যেন লতিফকে সবচাইতে বিব্রত করছিল।
চোখ সরিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে তিনি বাচ্চাটাকে দিলেন এক ধমক: “এই, চুপচাপ দাঁড়া তো, দ্বীনের ভাগী হবি না? খতনা ছাড়া মুসলমান হইতে পারবি না তো রে। তুই কি তাই চাস?” কান্নার রোলের ফাঁকে ছেলেটা সত্যটা বলেই দিল: “আমার খতনা আগেই হয়ে গেছে।”
উত্তেজিত হয়ে ছেলেটির মা প্রায় সাথে সাথেই বলল, “কিন্তু ঠিক কইরা হয় নাই, ভাইয়া… এইবার ঠিক কইরা করা যাইব।” লতিফ আহমেদ সন্দেহ করছিলেন ঠিকই কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের একজনকে ডেকে তিনি বললেন, “এই সামি, এই বাচ্চাটাকে ধরে দেখ তো।” দুষ্টু ছেলেদের কয়েকজন বিনোদনের খোরাক জোগাতে ছেলেটাকে আলতো করে উপরে তুলে ধরে ধরল, আর একজন তার শর্টটা টেনে নামাল। যেন অন্য কারো মাপে বানানো ঢোলাঢালা কাপড়টা সহজেই খুলে আসল। এই নাটক দেখতে দেখতে পুরো জমায়েত যেন হাস্যরসের দ্বারপ্রান্তে। “খতনা ঠিকঠাকই করা হয়েছে।” চেপে রাখা হাসিটা ছেলেরা এবার হেসে নিল। “যাও তোমার নাগররেও নিয়া আসো। তারেও খতনা করায় দেই যাতে তোমার আটা আর নারিকেলের ভাগ মেলে,” টিপ্পনি কাটল আরেকজন। আরেকটা হাসির রোল উঠল।
ছাড়া পেতেই ছেলেটা তার শার্টটা টেনে উঠিয়ে ভোঁ-দৌড় দিল। তার মা আরেকবার শাড়ির আঁচল টেনে মাথাটা ঢেকে পা টানতে টানতে বেরিয়ে গেলেন। “থু! এই দুনিয়া ভর্তি এত অসভ্য… এরা এতটাই নিচে নামতে পারে,” ঘেন্নায় থুতু ফেলতে ফেলতে বলল একজন।
লতিফ আহমেদ এর এতে বেশ অস্বস্তিই শুরু হল। এই দারিদ্র আর দুর্দশার সামনেও কি তবে তিনি ঊনমানুষের মতই আচরণ করলেন? মহিলাটার চিত্র বারবার তাঁর চোখে ভাসতে লাগল। “ছি, আমার ওকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়া উচিত হয় নি।” অনুতাপ নিয়েই তিনি মহিলাটাকে কিছুক্ষণ খুঁজে বেরালেন। তবে যেমন অকস্মাৎ আগমন, ঠিক সেভাবেই মহিলাটা যেন ধোঁয়ার মত উবে গিয়েছিল।
লাইনটা তার নিজের মত করেই আগাচ্ছিল, আর একে একে উদয় হচ্ছিল লাল লুঙ্গিগুলো। লতিফ সাহেব অধৈর্য্য হয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন—ততক্ষণে পাঁচটা বেজে গেছে। এলাকার প্রখ্যাত সার্জন, ডাঃ প্রকাশ, লতিফ সাহেবকে বলে রেখেছিলেন ছয়টার মধ্যে বাড়ির ছেলেদের খতনার জন্য তাঁর কাছে নিয়ে আসতে। এরা যে কি করছে এখন! রাজিয়া সকালেই সবাইকে গোসল করিয়েছেন— অবশ্য, বড় ছেলে সামাদকে একটু বাড়তি যত্ন দিয়েই গোসল করিয়েছেন। সামাদের বয়স পাঁচ পার হবার পর থেকেই প্রায় ছয় বছর ধরে রাজিয়া তাঁর স্বামীকে বলেই যাচ্ছেন, “চলো, সামাদকে খতনা করিয়ে দিই—দেখো কেমন পাতলা হয়ে গেছে!” রাজিয়া ভেবেছিলেন খতনার পরে ছেলেটার ওজন একটু বাড়বে। কিন্তু লতিফ সাহেবের সাহসে কুলাচ্ছিল না, বারবার নানান বাহানায় সময় পেছাচ্ছিলেন। অবশেষে সে সময় এসেই গেল। তবে তিনি তখনও ঘাবড়াচ্ছিলেন।
রাজিয়ার দেবরেরা তো অনুষ্ঠানে এসেছেনই, তাঁর বোনেরাও বেশ দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। বাড়ি ভর্তি অতিথি, বাচ্চাকাচ্চাদের গায়ে নতুন জামাকাপড়, আর খতনা করতে যাওয়া ছেলেগুলো গোয়ার্তুমি করে ছুটে বেরাচ্ছে। ছেলে-বুড়োরা মিলে যখন মসজিদে গণ খতনার আয়োজনে, স্থানীয় মেয়েরা ও বৃদ্ধা মহিলারা তখন লতিফ আহমেদের বাড়িতে জমায়েত হয়েছে।
দুপুরের পর বাড়ির লোকজন ছেলেদের শেরওয়ানি, নেহরু জ্যাকেট আর জরি টুপি পরে সারি সারি করে বসাল। আর তাদের গলায় এমন বড় মালা যা পা অবধি পৌঁছেযাবে। কব্জীতে প্যাঁচানো জুঁই ফুল। শুভাকাঙ্ক্ষীরাও আসলেন, বাচ্চাদের আদর দিলেন। কেউ হাতে সোনার আংটি পড়িয়ে দিলেন, কেউ বা উপহার দিলেন সোনার চেইন। পাঁচশো ও একশো টাকার এতগুলো নোট এল যে গুনে শেষ করা দায়। যারাই আসলেন, অশনীর ফুসমন্তর কাটাতে বাচ্চাদের মাথার উপরে বিষ ঝেড়ে দোয়া দিলেন— নজর না লাগুক। পান, কলা, নারকেলের পুলি পিঠা, আর অন্যান্য নাস্তাও পরিবেশন করা হল। খোশগল্পের সময় কারুরই নেই। সবার হুড়োহুড়ি আর গণ্ডগোলে বাড়িটার তখন পুরো গোলমেলে হাল…
সবেমাত্র লতিফ আহমেদকে কেউ একজন একটা চেয়ার এনে দিয়েছেন, ক্লান্ত পদযুগলকে খানিক বিশ্রাম দিয়ে গা এলিয়ে যেই কিনা একটা হাই তুলবেন– “আআআ…”–তখনই তাঁর সামনে একজন মহিলা এসে দাঁড়াল। পাতলা গড়ন, গায়ে পুরোনো একটা সোয়েটার—সেটাও ভেজা। মুখটা ফ্যাকাশে। বুকের কাছে কাপড়ে মোড়া গুটিশুটি মেরে থাকা কি যেন।
“ভাইয়া, দয়া কইরা এই বাচ্চাটার সুন্নত কইরা দেন…” লতিফ আহমেদ একবার মাসুম বাচ্চাটার দিকে তাকালেন— কাথায় মোড়া, হয়তো এক মাস হবে— তারপর তাকালেন তার মায়ের দিকে। মনে শঙ্কা দানা বাধা শুরু হল তাঁর— আশেপাশের উঠতি ছেলেপেলেরা যদি ঘিরে ধরে বাজে কিছু বলে বসে? বিনা বাক্যে তিনি পকেটে হাত দিলেন এবং একশো টাকার একটা নোট তার হাতে গুজে দিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল যেন রাজিয়াই সামাদকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মহিলাটা একবারো পেছনে না ফিরে হাটা ধরল। লতিফ সাহেব ভাবছিলেন যদি আগের মহিলাটাকেও কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করা যেত! কিন্তু, তাতে আরেকজন… তারপর আরেকজন… নিশ্চই তারপর আরো কেউ চাইতো… এরা যদি এভাবে আসতেই থাকে, তাহলে এর শেষ কই? শেষমেশ, সর্বশেষ বাচ্চাটার খতনা সম্পূর্ন হবার পরই সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে তবে লতিফ আহমেদ একটু ধাতস্থ হবার সুযোগ পেলেন। এখন তাঁর নিজের বাড়ির বাচ্চাদের দেখভালের পালা।
ছ’টা নাগাদ সবাই যখন সার্জনের কাছে যেতে প্রস্তুত, তখন লতিফ সাহেব বাড়ি ফিরলেন। ডাঃ প্রকাশ তাকে বলেছিলেন, “বাচ্চাদেরকে আমরা লোকাল অ্যানেস্থ্যাটিক দেব, তো ওরা কিচ্ছু টের পাবে না। এক রাত সুন্দর একটা ঘুম—তাতেই সকাল-সকাল সব তরতাজা হয়ে উঠবে।” পুরো পরিবার ডাঃ প্রকাশের ক্লিনিকে অপারেটিং রুমের বাইরে জমাট বেঁধে দাঁড়াল। বাচ্চাদের কেউ কেউ কান্নাকাটি আর হইচই করলেও সব সার্জারিগুলোই নির্বিঘ্নে শেষ হলো।
বাড়িতে ওদের দুরন্ত ফ্যানের নিচে নরম তোষকের ওপর শুইয়ে দেওয়া হলো। ফুট-ফরমায়েশ খাটবার জন্য একদল মানুষ খাটের পাশে থেকে গেল। মাঝেমাঝে এক-দুজন বাচ্চা ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলেও বাইরে তখনো হাসির ফুলঝুরি, জম্পেশ আড্ডা আর উৎসবের আমেজ ফুরাবার লক্ষণ নেই। প্রতি আধ ঘন্টা পরপরই ছেলেদের ঘুম থেকে তুলে, কাঠবাদাম পেস্টে দুধ আর পেইনকিলার মিশিয়ে খাইয়ে, আবার ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হতো। বেশিরভাগ তো পরের দিনই সুস্থ হয়ে উঠলো। আর হবেই বা না কেন— আরোগ্যের জন্য দুধ, ঘি, কাঠবাদাম, খেজুর… সবার জন্য পর্যাপ্ত– এতটাই যে কিছুটা ফেলেও দেওয়া লাগল।
খতনার পঞ্চম দিন উঠোনে একটা ঘটনা ঘটলো। নিচতলায় নেমে বাইরে তাকাতেই রাজিয়া দেখে আরিফ পেয়ারা গাছে উঠে সেই আধ-পাকা ফল পাড়তে ব্যস্ত। চাকরদের দুজন মিলে চিৎকার করে তাকে নিচে ডাকছিল। এদিকে গাছ তলায় দাঁড়িয়ে তার মা আমিনা একদিকে চাকরদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছিল আরেকবার ছেলেকে গাল দিচ্ছিল। ফল পাড়া হয়ে এলে আস্তে ধীরে যেই আরিফ নিচে নামলো, চাকররা মিলে ওকে আটকে ফেলল। তারা যখন আরিফকে রাজিয়ার কাছে নিয়ে আসলো, আরিফ তখন কোন ভনিতা ছাড়াই পকেট থেকে আরেকটা পেয়ারা বের করে চাবানো শুরু করল। আরিফকে ছেড়ে দিতে চাকরদের হুকুম দিল রাজিয়া, আর অপার বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোর ঘা শুকিয়েছে?”
“হু…হ্যা, চিক্কাম্মা (খালাম্মা),” কোনরকমের লাজ-শরম ছাড়াই লুঙ্গিটা সরিয়ে আরিফ উত্তর দিল। রাজিয়া নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সেখানে কোন ব্যান্ডেজও নেই। কতটা সেরে গেছে, এমনকি কোন পুঁজও নেই। এদিকে তার ছেলে, সামাদ, নিজের পা টেনেই সোজা করতে পারছিল না। এতশত অ্যান্টিবায়োটিক-এর পরেও ঘা তে ছড়িয়েছিল ইনফেকশন। ওই সকালেই তো, গোসলের জন্য সামাদ হেঁটে হেঁটে বাথরুম পর্যন্তই যেতে পারছিল না। বাকিদের তাকে তুলে নিয়ে চেয়ারে বসাতে হয়েছিল। ক্ষতস্থানে যেন পানি না লাগে, সেজন্য চারপাশটায় একটা স্টেরাইলাইজড ইস্পাতের কাপ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল। এরপর সে ক্লান্ত হয়ে পরল। খুব সাবধানে তার গা মুছে দেয়া হল। ডাঃ প্রকাশের পাঠানো এক নার্স ক্ষতটায় আবার ব্যান্ডেজ করে তাকে একটা ইনজেকশন দিলেন। আর এদিকে আরিফ, বাঁদরের মতো গাছে উঠে লাফাচ্ছে। “কি ওষুধ খাচ্ছিস রে, আরিফ– কেমন ধরনের বড়ি?” রাজিয়া জিজ্ঞেস না করে পারলেন না। “কোন ওষুধই খাইনি, চিক্কাম্মা। এই ওরা কিছু ছাই ডলে দিল, এই তো…”
গরিব মানুষদের খতনা কিভাবে হয়, রাজিয়া তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। ক্ষতস্থানে ছাই দেবার কথা শুনে তার ভেতরটা খুব অশান্ত হয়ে উঠলো। এই অসহায় বাচ্চাগুলোর কেউ মারা গেলে কি হত— এই দুশ্চিন্তা করতে করতে রাজিয়া ভেতরে গেলেন। তিনি উপরের কামরায় থাকা বাকি বাচ্চারা ঘুমোচ্ছে কিনা দেখে এসে তার ছেলেকে দেখতে গেলেন। সামাদও তখন ঘুমাচ্ছিল। তার পাশের চা-টেবিলটায় গাদাগাদা, স্তুপ জমে থাকা মিষ্টি, বিস্কু্ট ভাজা ও শুকনো ফল। আরিফকে উপরে ডেকে অন্তত এক প্যাকেট বিস্কুট ধরিয়ে দেওয়ার জন্য উনি জানালা খুলে বাইরে উঠোনের দিকে তাকালেন। কিন্তু কোথাও আরিফের কোন চিহ্নই নেই। ছেলের গায়ে একটা পাতলা কম্বল টেনে উনি রসুইতে গেলেন রান্নার তদারকি করতে।
খতনা করা ছেলেদের জন্য ছিল চিকেন স্যুপ, তাঁর সাথে সাথে অতিথিদের জন্য পোলাও আর কোরমা—তবে আমিনার সঙ্গে রান্নাঘরে রাজিয়া দশ মিনিট না কাটতেই তাঁর ভেতরে কেমন যেন একটা অস্বস্তি জাগল। তিনি দেখভাল না করলে খাবার সময় মতো তৈরি হবে না জেনেও তাঁর দৌড়ে উঠে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। যে মুরগির কোরমাটা সে দেখছিল, তা ফেলেই সে ছুটে গেল উপরে।
সামাদ যেন নিঃশব্দে ঘুমাতে পারে, রাজিয়া সেজন্য ঘরের দরজা টেনে বন্ধ করে রেখেছিলেন। তিনি দরজা ঠেলে খুলে দিলেন — আর একটি গা-হীম করা চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এলো। পরিবারের সবাই তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখতে পেল রাজিয়া অচেতন, আর রক্তে ভেজা সামাদ মেঝেতে শুয়ে আছে। সে মাকে খুঁজতে উঠেছিল, কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। আর তখনই দেয়ালে মাথা ঠুকে ঝরা শুরু করেছিল রক্ত। অপারেশনের ক্ষত খুলেও রক্ত পড়ছিল। দ্রুত সামাদকে হাসপাতালে নেয়া হলো।
খতনার এগারো দিন পরে লতিফ আহমেদের পরিবারের ছেলেগুলোকে রীতিমতো ঘটা করে গোসল করানো হল। একই দিন সামাদও হাসপাতাল থেকে ফেরে। সেই সন্ধ্যায় বাড়িতে বড় ধরনের আয়োজন। পুরো শহরকে আমন্ত্রিত করা হয়েছিল। কয়েকটা ছাগল জবাই করে এক বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল । বাড়ির সামনের উঠোনে আর ছাদের ওপর শামিয়ানা লাগানো হল। পেছনের উঠোন বিরিয়ানির ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে। সামাদ এখনও খুব দুর্বল—রাজিয়া তাকে নিজের আড়াল করতেই পারতেন না। সামাদের মাথা কোলে নিয়ে ডিভান থেকে না উঠেই তিনি অতিথিদের আপ্যায়ন করছিলেন।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ রাজিয়া খেয়াল করলেন কেউ গুটিগুটি পায়ে ড্রয়িংরুম পার হচ্ছে। “এই, কে রে? এদিক আয়,” বললেন তিনি। সে বান্দা ফিরে আসলো। “আমি, চিক্কাম্মা…” রাজিয়ার চোখ গোল গোল হয়ে উঠলো। এটাতো আরিফ! এমনকি ছেড়া কলার ওয়ালা পুরনো হয়ে যাওয়া শার্টের ভেতর থেকেও তার সুস্বাস্থ্যের আভা ফুটে উঠেছিল। লাল লুঙ্গিটা ছেড়ে সে ট্রাউজার পড়া শুরু করেছে। অর্থাৎ, ক্ষত পুরোপুরি সেরে গেছে। অশ্রুভরা চোখের সামাদের দিকে ফিরে উনি বিড়বিড় করে নিজেকে বললেন “খার কো খুদা কা ইয়ার, গরিব কো পরওয়ারদিগার”— বড়লোকের তেলা মাথায় তেল দিতে অনেকে থাকলেও গরিবের আছে শুধু ওপরওয়ালা।
রাজিয়ার নজর আরিফের প্যান্টের দিকে ঠেকল—হাঁটুর কাছে সেটা পাতলা হয়ে ফেটে ছিঁড়ে গেছে। রাজিয়াকে নিঃশব্দে ভাবনায় হারিয়ে যেতে দেখে আরো বড় দুটো ছিদ্রের জানান দিতে আরিফ ঘুরে দাঁড়ালো—প্যান্টে আরেকটা বড় ছিদ্র, শার্টে আরও একটা।
“দাড়া তো, আরিফ,” রাজিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বললেন। তিনি আলমারি খুলে পরিপাটি করে সাজানো কাপড়ের এক স্তূপের দিকে তাকালেন। সামাদকে উপহার হিসেবে দেয়া প্রায় ডজনখানিক পোশাক এখনও প্যাকেটে পড়ে ছিল। সামাদের যে ট্রাউজার আর টি-শার্টগুলো বড় হয়, সেগুলো থেকে তিনি এক জোড়া ট্রাউজার আর একটা টি-শার্ট তুলে আরিফকে দিতে দিতে বললেন, “নে এগুলো। পরে খেতে আসলে এগুলো পরে আসিস, ঠিক আছে?”
কাপড়গুলো পেয়ে আরিফের চোখে একটা আনন্দের ঝিলিক বয়ে গেল। রাজিয়ার দিকে সে যেভাবে তাকালো—তা কৃতজ্ঞতার চাইতেও ভক্তির বেশি । টি-শার্টটা সে আস্তে করে ছুঁয়ে দেখল, আর রাজিয়া হাসল। সামাদ উঠে বসল ও মাথাটা তার কাঁধে রেখে নিল। রাজিয়ার দেয়া কাপড়গুলি বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগুবার সময় আরিফ বারবার পিছন ফিরে দেখছিল।
