ব্রিজে দেখা হওয়া বুড়ো লোকটা// মূল: আর্নেস্ট হেমিংওয়ে// অনুবাদ: জান্নাতুল ফেরদৌস পুষ্প

ময়লা পোশাক পরা এক বুড়ো রাস্তার ধারে বসে ছিল। তার চোখে চিকন স্টিলের ফ্রেমের চশমা। গাড়ি, ট্রাক, পুরুষ, মহিলা ও শিশু সবাই নদীর ওপরের ভাসমান ব্রিজটা দিয়ে পার হচ্ছিল। ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়া খচ্চরটানা গাড়িগুলো নদীর খাড়া তীর ধরে উঠতে গিয়ে বেঁধে গেলে সৈনিকরা গাড়ির চাকা ঠেলে সেগুলো পার করে দিচ্ছিল। ট্রাকগুলো পার হচ্ছিল। আর কৃষকের দল পুরু ধুলো মাড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বুড়োটা না নড়ে ঠায় বসে ছিল। তার আর নড়ার কোনো শক্তি ছিল না। 

আমার দায়িত্ব ছিল শত্রুপক্ষ ব্রিজের ঐ পাড়ে কতদূর পর্যন্ত এসেছে তার খবর নেওয়া। পথচারি বা গাড়ি তখন বেশি একটা নেই। শুধু বুড়োটা বসে ছিল। 

আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, “বাড়ি কোথায়?” 

সে হেসে বলল, “সান কার্লোসে”। বাড়ির কথা মনে পড়ায়, সে একটা তৃপ্তির হাসি হাসল। বুড়ো জানাল, “আমি পশু-পাখির দেখভাল করছিলাম।” 

আমি না বঝেুই বললাম, “ও আচ্ছা।” 

সে বলল, “পশু-পাখির দেখভাল করতে গিয়ে রয়ে গিয়েছিলাম। আমিই সবার শেষে সান কার্লোস ছেড়েছি।” 

তাকে মোটেও রাখাল বা মেষপালক বলে মনে হচ্ছিল না। বুড়োটির গায়ে ধূলোভরা গাঢ় রঙের জামা, সাথে ধুলোমাখা ধূসর মুখ, আর চোখে চিকন স্টিলের চশমা। 

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কোন ধরনের পশুপাখি পালতেন?” 

তাদের ফেলে আসার জন্য আফসোস করতে করতে মাথা নাড়িয়ে সে বলল, “তা আছে কয়েক ধরনের।” 

ব্রিজটার ওপর আর আফ্রিকার গ্রামাঞ্চল সদৃশ এব্রো ডেল্টার ওপর নজর রাখছিলাম আমি, ভাবছিলাম আর কতক্ষণ বাদে শত্রুর দেখা পাব। কোনো সংকেত বা অস্বাভাবিক কিছু শোনার জন্য কান পেতে বসেছিলাম। বুড়োটি তখনও সেখানেই বসেছিল। 

আমি তাকে আবারও জিজ্ঞেস করলাম, “কী কী পশুপাখি?”

সে বলল, “সব মিলে তিন ধরনের পশুপাখি। তার মধ্যে দুটি ছাগল, একটি বিড়াল ও চার জোড়া ঘুঁ ঘুঁ।” 

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আর সেগুলো ফেলে রেখে চলে আসতে হলো?” 

বুড়ো বলল, “হ্যাঁ, কামানের গোলার কারণে। কামানের গোলার কারণে ক্যাপ্টেন আমাকে চলে আসতে বলেছিল।” 

দূরে ব্রিজের শেষ মাথাটার দিকে তাকিয়ে আমি তাকে বললাম, “আপনার পরিবারে আর কেউ নেই?” তখনও নদীর তীর ধরে কতগুলো গাড়ি তড়িঘড়ি করে নেমে আসছিল। 

বুড়ো বলল, “পশুপাখিগুলো ছাড়া আমার আর নিজের কেউ নেই। বিড়াল নিজের খেয়াল রাখতে পারে। আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে অন্যগুলোকে নিয়ে।” 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোন দল করেন আপনি?” সে তার ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,”আমি কোনো দল করি না। বয়স ছিয়াত্তর পেরিয়েছে। বারো কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এসেছি, আর আগানোর কোনো শক্তি নেই।” 

আমি বললাম, “তা যাই হোক, আপনি এখানে বসে থাকতে পারবেন না। এই জায়গা মোটেও নিরাপদ না। কষ্ট করে রাস্তার উপরে ওই ট্রাকে গিয়ে উঠুন। ওটা টার্টোসা যাবে।” 

সে বলল, “আচ্ছা, আমি আরেকটু জিরিয়ে চলে যাচ্ছি। ওটা কোথায় যাবে যেন?” 

আমি বললাম, “বার্সেলোনার দিকে।” 

বুড়ো বলল, “ওদিকে আমি কাউকে চিনি না। তারপরও আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।” শূন্য দৃষ্টিতে খুব ক্লান্তি নিয়ে সে আমার দিকে তাকাল, নিজের উৎকণ্ঠার কথা কারো সাথে ভাগ করে নেয়ার জন্যেই যেন সে বলল, “আমি নিশ্চিত, বিড়ালটা ঠিকঠাকই থাকবে। ওকে নিয়ে এত অস্থির হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আপনার কি মনে হয়, বাকিদের কী হবে?” 

“ওরাও হয়তো ঠিকঠাকই থাকবে।” 

“আপনার তাই মনে হয়?” 

নদীর তীরে তখন আর একটা গাড়িও নেই। সেদিকেই তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি বললাম, “নিশ্চয়ই।” 

বুড়ো চিন্তিত কন্ঠে বলল, আমাকেই তো ওই কামানের গোলা এড়াতে চলে আসতে বলা হল, তাহলে ওরা কীভাবে থাকবে ওখানে?

আমি বললাম, “আপনি ঘুঁ ঘুঁর খাঁচা খুলে রেখে আসেননি?” 

সে বলল, “হ্যাঁ, খুলে দিয়েছি।” 

আমি বললাম, “তাহলে তো ওরা উড়েই যাবে।” 

সে বলল, “হ্যাঁ, তা ঠিক। ওরা তো উড়েই যাবে। কিন্তু বাকিদের কী হবে?” পরক্ষণেই নিজেকে শান্ত করতে বুড়ো বলল,”আমার আর বাকিদের নিয়ে ভাবা ঠিক না।” 

আমি তাকে বললাম, “আপনার যদি বিশ্রাম নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে উঠে পড়ুন। আমাকেও এখান থেকে যেতে হবে।” 

সে আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু একটু গিয়েই টলতে টলতে ধুলোর মধ্যে বসে পড়ল। আর নিজে নিজে বিড়বিড় করতে লাগল, “আমি তো শুধু পশুপাখিগুলোর যত্নই নিচ্ছিলাম…” এবার তার কথাগুলো আর আমাকে উদ্দেশ্য করে নয়। “আমি তো শুধু পশুপাখিগুলোর যত্নই নিচ্ছিলাম।” 

বুড়ো লোকটাকে নিয়ে আর কিছু করার ছিল না। দিনটা ছিল ইস্টার সানডের দিন, ফ্যাসিস্টরা এব্রোর দিকে ধেয়ে আসছিল। ঘন কালো মেঘে ঢাকা আকাশ যেন নীচে নেমে এসেছিল। তাই সেদিন ফ্যাসিস্টদের যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে ওড়েনি। আর বিড়ালরা যে নিজেদের যত্ন নিতে জানে সেটাই ছিল ঐ বুড়োর বাকি জীবনের জন্য বরাদ্দ একমাত্র সৌভাগ্য।

About The Author

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *