এক ঘন্টার একটা গল্প// মূল: কেইট শপেন// অনুবাদ: শাহ ইলমা

মিসেস ম্যালার্ড হার্টের রোগী। তাই তার স্বামীর মৃত্যুর খবরটা তাকে খুব সতর্কতার সঙ্গে এবং যতটা সম্ভব কোমলভাবে জানানো হয়, যেন হঠাৎ এই দুঃসংবাদ শুনে তার শারীরিক অবস্থার কোনো ক্ষতি না হয়।

মিসেস ম্যালার্ডের বোন জোসেফিন খুব সাবধানে তাকে স্বামীর মৃত্যুর খবরটা জানান। নিজে জানার সাথে সাথেই বোনকে না বলে ধীরে ধীরে ইঙ্গিতে মৃত্যুর খবরটা জানানোর চেষ্টা করেন জোসেফিন। তাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রিচার্ডসও সেখানে উপস্থিত। ট্রেন দুর্ঘটনার খবর যখন প্রথম সংবাদপত্রের অফিসে পৌঁছায় তখন রিচার্ডস সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নিহতদের তালিকায় সবার আগে ব্রেন্টলি ম্যালার্ডের নাম দেখতে পান তিনি। আরও একটা টেলিগ্রাম মারফত তিনি খবরটার সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হন। পাছে অন্য কেউ অসাবধানতাবসত এই দুঃসংবাদ হুট করে পরিবারটাকে দিয়ে বসে এই চিন্তা করে তিনি দ্রুত ম্যালার্ডদের বাড়ি চলে আসেন।

এ ধরনের দুঃসংবাদ শুনে অনেক নারী প্রথমে তা বিশ্বাসই করতে পারেন না। কিন্তু মিসেস ম্যালার্ডের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। খবরটা শোনামাত্র তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বোন জোসেফিনের বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর কান্না থামলে তিনি একাই নিজের ঘরে চলে যান । তিনি একা থাকতে চান, তাই কাউকে তাঁর সঙ্গে যেতে দেন না।

তার ঘরে খোলা জানালার সামনে একটা বড় আরাম-চেয়ার রাখা। তিনি সেখানে গিয়ে বসেন। গভীর শোকে তার শরীর ভীষণ ক্লান্ত, আর ক্লান্তি যেন তার মনকেও ভারী করে তোলে।

তিনি খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন। সামনে থাকা গাছের ডালগুলো বসন্তের বাতাসে ধীরে ধীরে দোলে। সাথে বৃষ্টির পরের বাতাসে সতেজ গন্ধ ভাসে। নিচের রাস্তায় এক ফেরিওয়ালা ডেকে যায়। দূর থেকে কারও গানের আওয়াজ শোনা যায়। বাড়ির কার্নিশে কয়েকটা ছোট চড়ুই আনন্দে কিচিরমিচির করে।

মেঘের ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশ দেখা যায়। চেয়ারে মাথা এলিয়ে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেন মিসেস ম্যালার্ড। মাঝে মাঝে তার গলা থেকে চাপা কান্নার শব্দ বেরিয়ে আসতে থাকে। অনেকক্ষণ কান্না করার পর ঘুমিয়ে পড়া শিশুরা যেমন ঘুমের ভেতর মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, মিসেস ম্যলার্ডের অবস্থা ঠিক তেমন।  

মিসেস ম্যালার্ড যুবতী নারী। তার মুখে শান্তভাব, কিন্তু সেই শান্ত মুখেও দীর্ঘদিনের চাপা কষ্টের চিহ্ন স্পষ্ট। একই সঙ্গে তার মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপের ছাপ দেখা যায়। তিনি নীল আকাশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। মনে হয়, তিনি যেন কিছুই ভাবছেন না। তার মনে ধীরে ধীরে এক অজানা অনুভূতি তৈরি হয়।

তিনি অনুভব করেন, অজানা এক অনুভূতি ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ধরছে। তাতে তার ভয় হয়। কিন্তু তিনি সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা বুঝতে পারেন না। আর তাই সেটাকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। তবু তার মনে হয়, আকাশ, বাতাসের গন্ধ, চারপাশের শব্দ আর প্রকৃতির সবকিছুর মধ্য দিয়ে সেই অনুভূতিটা তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

তার বুক দ্রুত ওঠানামা করতে থাকে। তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, আসলে ঠিক কোন অনুভূতিটা তাকে পেয়ে বসেছে। তিনি নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সেটাকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারেন না। তার ঠোঁট থেকে খুব আস্তে আস্তে একটা শব্দ বেরিয়ে আসে, “মুক্ত! মুক্ত! মুক্ত!”

তিনি বারবার ফিসফিস করে বলেন, “মুক্ত! মুক্ত! মুক্ত!” ধীরে ধীরে তার চোখে থাকা ভয়ের ছাপ  মিলিয়ে যায়। চোখে ফিরে আসে এক নতুন উজ্জ্বলতা। তার হৃদস্পন্দন বাড়তে থাকে, আর সারা শরীরে যেন নতুন শক্তি ও প্রাণের সঞ্চার হয়।

এই অনুভূতি ঠিক না ভুল তা নিয়ে তিনি একবারও ভাবেন না। তিনি জানেন, তার স্বামীর নিথর দেহ দেখলে তার আবারও কান্না পাবে। তিনি এও জানেন, ব্রেন্টলি ম্যালার্ড তাকে ভালোবাসতেন এবং সবসময় তার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। তবু এই মুহূর্তের দুঃখের বাইরে তিনি এমন এক ভবিষ্যৎ দেখতে পান, যেখানে জীবনের প্রতিটা দিন শুধুই তার নিজের হবে। সেই নতুন জীবনকে তিনি যেন দুহাত বাড়িয়ে স্বাগত জানান।

এবার থেকে তাকে আর অন্য কারো জন্য নিজের জীবন কাটাতে হবে না। তিনি নিজের ইচ্ছামতো বাঁচবেন। আর কারও ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত তার জীবনের ওপর প্রভাব ফেলবে না। তিনি বুঝতে পারেন, ভালো উদ্দেশ্যেই হোক বা খারাপ উদ্দেশ্যেই হোক, একজন মানুষের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া কখনোই ঠিক না । সেই মুহূর্তে এই সত্যটা তার কাছে একেবারে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

তিনি স্বামীকে ভালোবেসেছিলেন, তবে সব সময় নয়। অনেক সময় তার মনে ভালোবাসা ছিল না। কিন্তু এখন আর সেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। ভালোবাসা যত গভীর বা রহস্যময়ই হোক না কেন, নিজের স্বাধীনতা, নিজের পরিচয় এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অনুভূতির কাছে তা যেন অনেক ছোট হয়ে যায়। তিনি আবার ফিসফিস করে বলেন, “আমার শরীর আর মন দু’টোই এখন মুক্ত।“

এদিকে জোসেফিন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বারবার অনুরোধ করেন, “লুইস, দরজা খোলো। দয়া করে দরজা খোলো। তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। কী করছো তুমি? দোহাই লাগে, দরজা খোলো।”

ভেতর থেকে লুইস শান্ত স্বরে বলেন, “তুমি চিন্তা করো না। আমি ঠিক আছি।” খোলা জানালা দিয়ে আসা বাতাসে তিনি যেন নতুন জীবনের স্বাদ অনুভব করেন।

তিনি নিজের আশু ভবিষ্যতের কথা ভাবতে থাকেন। গ্রীষ্ম কিংবা বসন্ত না, বছরের প্রতিটা দিন এখন শুধু তারই হবে। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করেন, তার জীবন যেন দীর্ঘ হয়। অথচ আগের দিন পর্যন্ত দীর্ঘ জীবন ভাবলেই তার মনে ভয় জাগত।

কিছুক্ষণ পর তিনি উঠে দরজা খোলেন। তার চোখে নতুন জীবনের আনন্দ আর এক ধরনের বিজয়ের অনুভূতি। নিজের অজান্তেই তার চলাফেরায় আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে, যেন তিনি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। বোনের কোমরে হাত রেখে একসঙ্গে নিচে নেমে আসেন দু’জন। নিচে রিচার্ডস তাদের জন্য অপেক্ষারত।

ঠিক সেই সময় সামনের দরজায় তালা খোলার শব্দ শোনা যায়।

ঘরে ঢোকেন ব্রেন্টলি ম্যালার্ড। তিনি ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরলেন। তার হাতে একটা ব্যাগ ও একটা ছাতা, আর কাপড়ে ধুলোর ছাপ। তিনি দুর্ঘটনাস্থলের ধারেকাছেও ছিলেন না। তাই ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়া তো দূরের কথা, এমন কোনো দুর্ঘটনা যে ঘটেছে তাই তিনি জানেন না।

তাকে হঠাৎ সামনে দেখে জোসেফিন চিৎকার করে উঠলেন। রিচার্ডস দ্রুত তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে আড়াল করার চেষ্টা করলেন, যাতে হঠাৎ স্বামীকে দেখে না ফেলেন লুইস। কিন্তু রিচার্ডসের দেরি হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে ডাক্তার এসে জানান, হৃদরোগে মিসেস ম্যালার্ডের মৃত্যু হয়েছে।

ডাক্তারদের ধারণা, হঠাৎ স্বামীকে জীবিত দেখে তিনি আনন্দে এতোটাই অভিভূত হয়ে পড়েন যে, সেই প্রবল আনন্দেই তার মৃত্যু হয়।

About The Author

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *